২০১৮ আর ২০২২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতার পর এবার অনেকটা নীরবে-নিভৃতেই বিশ্বকাপ শুরু করেছিল জার্মানি। অথচ এক সময়ের ফুটবল পরাশক্তি এই দলটিকে এবার ফেভারিটের তালিকায় রাখা হয়েছে সাত নম্বরে—যা তাদের ইতিহাসের সঙ্গে একদমই বেমানান।
তবে প্রথম ম্যাচ জিতে অন্তত একটা স্বস্তির জায়গা তৈরি করতে পেরেছে দলটি, যা গত দুই বিশ্বকাপে তারা পারেনি। এর ফলে ২০১৪ সালের সেই স্মরণীয় ফাইনালের পর এই প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে ওঠা প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জন্য। তবে তারা গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে এগোবে, নাকি কোনোরকমে টেবিলের নিচের দিক থেকে পরের রাউন্ডে যাবে সেটা নির্ভর করছে আজ রাতের ম্যাচের ফলাফলের ওপর। বাংলাদেশ সময় রাত দুটায় টরন্টোতে আইভরি কোস্টের মুখোমুখি হবে জার্মানি।
গ্রুপ ‘ই’-এর প্রথম রাউন্ডে দুই দলই জিতেছিল, তবে দুই জয়ের ধরন ছিল একদম বিপরীত মেরুর। জুলিয়ান নাগলসম্যানের শিষ্যরা শুরুতে কুরাসাওয়ের কাছে গোল হজম করলেও শেষমেশ ৭-১ গোলের বিশাল জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে। অন্যদিকে ‘দ্য এলিফ্যান্টস’ নামে পরিচিত আইভরি কোস্টের জয়টা এসেছিল রীতিমতো ভাগ্যের জোরেইকুয়েডরের তিনটি শট পোস্টে লেগে ফিরে আসার পর শেষ মুহূর্তের নাটকীয় গোলে কোনোমতে ১-০ ব্যবধানে জিতেছিল আফ্রিকান দলটি।
আজকের ম্যাচে জিতলেই গ্রুপের সেরা দুইয়ে থেকে শেষ ৩২-এ জায়গা পাকা করে ফেলবে জার্মানি। এমনকি এই ম্যাচের চার ঘণ্টা পর কানসাস সিটিতে ইকুয়েডর যদি কুরাসাওকে হারাতে না পারে, তাহলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়াও প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাবে জার্মানদের জন্য।
তবে পরিস্থিতি জটিলও হতে পারে। জার্মানি আইভরি কোস্টকে হারানোর পরও যদি ইকুয়েডর তাদের বাকি দুই ম্যাচআগে কুরাসাও এবং পরে গ্রুপের শেষ ম্যাচে জার্মানিকে হারিয়ে দেয়, তাহলে জার্মানি, আইভরি কোস্ট ও ইকুয়েডর তিন দলেরই পয়েন্ট ৬-এ গিয়ে সমান হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে গ্রুপের ভাগ্য নির্ধারণে কাজে লাগবে নতুন টাইব্রেকার নিয়ম।
গ্রুপে প্রথম নাকি দ্বিতীয় হওয়া—এই পার্থক্যটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন দলকে নকআউটে খেলতে হবে অন্য গ্রুপের তুলনামূলক সহজ কোনো তৃতীয় স্থান পাওয়া দলের বিপক্ষে। রানার্স-আপ দলকে পড়তে হবে ফ্রান্স, নরওয়ে, সেনেগাল ও ইরাকের কঠিন গ্রুপের রানার্স-আপের মুখোমুখি। আর তৃতীয় হয়ে কোনোমতে উঠলে প্রতিপক্ষ হতে পারে ইংল্যান্ড বা মেক্সিকোর মতো শক্তিশালী কোনো গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন।
অবশ্য সাম্প্রতিক ফর্ম বিবেচনায় জার্মানির জন্য এসব সমীকরণ নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তার কারণ নেই। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত টানা ১০ ম্যাচে জিতেছে দলটি, এবং এর মধ্যে ৯ ম্যাচেই প্রতিপক্ষের জালে অন্তত দুই গোল দিয়েছে তারা।
তবে রক্ষণে এখনো ভুগছে জার্মানরা। বিশ্বকাপে টানা সাত ম্যাচে গোল হজম করেছে দলটি, যা ১৯৭০ সালের পর তাদের সবচেয়ে দীর্ঘ এমন রেকর্ড। সবশেষ কোনো ক্লিন শিট তারা পেয়েছিল ২০১৪ সালে, ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত সেই ঐতিহাসিক ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে।
অন্যদিকে আইভরি কোস্ট নামছে টানা পঞ্চম জয়ের লক্ষ্য নিয়ে। বিশ্বকাপের ঠিক আগে গত ৪ জুন প্যারিসে এক প্রীতি ম্যাচে বিশ্ব র্যাংকিংয়ের তিন নম্বর দল ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল তারা, যা দলটির আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। চলতি বছরে তাদের সবশেষ হার ছিল জানুয়ারিতে, আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের কোয়ার্টার ফাইনালে মিশরের কাছে।
কোচ ইউলিয়ান নাগলসম্যান সম্ভবত কুরাসাওকে উড়িয়ে দেওয়া একই একাদশেই ভরসা রাখবেন, যদিও তাতে কিছুটা হতাশ হতে হতে পারে ডেনিজ উন্দাভকে। স্টুটগার্টের এই ফরোয়ার্ড গত ম্যাচে জামাল মুসিয়ালার বদলি হিসেবে নেমে শেষ ২৬ মিনিটে নিজে একটি গোল করার পাশাপাশি আরও দুটি গোলে সহায়তা করেছিলেন—যার সুবাদে ২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই বিখ্যাত সেমিফাইনালের পর নিজেদের সবচেয়ে বড় জয় পায় জার্মানি। বহুমুখী এই ফরোয়ার্ড এখন পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়ে মাত্র ১০ ম্যাচ খেলেই ৭ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট করেছেন।
আইভরি কোস্টের কোচ এমার্স ফায়েকে অবশ্য একাদশ সাজাতে গিয়ে বেশ কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইকুয়েডরের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে আক্রমণভাগে শুরু করেছিলেন ইলি ওয়াহি, তবে ম্যাচের এক ঘণ্টা পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁর জায়গায় মাঠে নামানো হয় অঁজে-ইয়োয়ান বোনিকে।
ভিসাজনিত জটিলতায় প্রথমে কানাডায় ঢোকার অনুমতি আটকে গিয়েছিল ইলি ওয়াহির। গত মাসে লিগ ওয়ানের ক্লাব নিসের হয়ে খেলার সময় একটি স্পোর্টস বেটিং কেলেঙ্কারিতে তাঁর নাম জড়িয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকে ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, ফলে এই ম্যাচে তাঁর খেলার সম্ভাবনা এখনো রয়েছে। আক্রমণভাগে কোচ ফায়ের হাতে বোনি ছাড়াও বিকল্প হিসেবে আছেন প্রথম ম্যাচে বেঞ্চে থাকা উমার ডিয়াকিতে ও ইভান গেসান্দ।