কম্পিউটার আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ন অংশ হয়ে রয়েছে। তাই তার নিরাপত্তা আমাদের জন্যে অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। আমাদের উচিৎ এই কম্পিউটার বিষয়ক সর্বাধীক সচেনতা সমন্ধে জেনে নেওয়া এবং এই ক্ষতিকর ভাইরাস থেকে সম্পুর্ন নিরাপত্তা বজায় রাখা।
আমরা যখন কম্পিউটার সমন্ধে ভালো করে জেনে নিতে পারবো, এবং কম্পিউটারের বিভিন্ন ক্ষতিকর ভাইরাস সমন্ধেও জেনে নিতে পারবো, তখন এই ধরনের ক্ষতিকর ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকা আমাদের জন্য অনেক অনেক সহজ হতে থাকবে।
কম্পিউটার ভাইরাস কি
তুমি যদি কম্পিউটারের সফটওয়্যার সমন্ধে ধারনা রাখো, তাহলে ভাইরাস সমন্ধেও সহজে ধারনা পেতে পারো। কম্পিউটারের সফটওয়্যার হচ্ছে সেই জিনিস, যেটি নিদিষ্ট ভাষায় (প্রগ্রামিং) লেখা থাকে, যে তুমি কোথায় ক্লিক করলে, কোথায় ইনপুট করলে সে কি ধরনের আচানর করবে বা কি ধরনের কাজ সম্পুর্ন করবে। এবং তোমার ক্লিক পেলে বা নির্দেশ পেলে সেই সেই সকল কাজ করতে শুরু করে। এর মধ্যে এমন ও কিছু কাজ করতে থাকে, যা হয়তো বা তুমি নিজেও জানো না, তবে সেটি ভালো, যেমন – তুমি ইন্টারনেট চালু করলে, তোমার কম্পিউটারের কোন একটি প্রয়োজনীয় ফাইল অনলাইন স্টোরেজে আপলোড, হয়তোবা কখনো কখনো প্রয়োজনীয় অ্যাপের ছোট খাটো ফিচার আপডেট সহ ইত্যাদি ছোট ছোট টাস্ক।
যখন তুমি কম্পিউটারের সফটওয়্যার কে বুঝতে পারো, তখন তুমি কম্পিউটারের ভাইরাস কেও এক কথায় বুঝতে সক্ষম। কম্পিউটারের যে সকল সফটওয়্যার বা নির্দেশনা ভিসিবল- হাইড অবস্থায় তোমার বিভিন্ন ফাইলের সাথে বা বিভিন্ন মাধ্যমে তোমার কম্পিউটারে অবস্থান করে, তখন সে তার আবিষ্কারক (প্রগ্রামার) এর দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী তোমার কম্পিউটারে বিভিন্ন প্রেশার তৈরি করে, যা তোমার হার্ড ওয়্যারের ক্ষতি করতে পারে এবং তোমার কম্পিউটারের ডেটাকেও ক্ষতি করতে পারে।
আবার কখনো কখনো তোমার অজান্তেই তোমার ফাইল রিমুভ বা হ্যাকারের দেওয়া সার্ভার লোকেশনে পাঠাতে পারে। মাঝে মাঝে তারা বিভিন্ন ভাইরাসের মাধ্যমে ফাইল লক করেও রাখে, এবং অনেক সময় সেটি খোলার জন্য তারা টাকা দাবি করে থাকে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে কম্পিউটার ভাইরাস হচ্ছে বিশেষ এক ধরনের সফটওয়্যার যা আসলে কম্পিউটারের ক্ষতি করে এবং বিভিন্ন মাধ্য়মে কাজ করতে পারে, সেটি ইনস্টল ছাড়াও কাজ করতে পারে এবং বিভিন্ন মাধ্য়মে কম্পিউটারে প্রবেশ করতে পারে।
তুমি যদি কম্পিউটারের বিষয়ে এবং মোবাইল ও অন্যান্য প্রযুক্তি বিষয়ে নিত্য় নতুন তথ্য় পেতে চাও, তাহলে তুমি আমাদের নটিফেকেশন চালু করে রাখতে পারো।
১০ টি কম্পিউটার ভাইরাসের নাম
বর্তমান সময়ের শার্ষের অবস্থানে থাকা ১০ টি কম্পিউটার ভাইরাসের নাম ও তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য- ক্ষতির পরিমাণ সমন্ধে জানানো হলো। তবে বলে রাখা ভালো, এমনো কিছু ভাইরাস রয়েছে যা এখনো কোন কোম্পানি জানেও, শুধুমাত্র এর আবিষ্কারক বা আবিষ্কারক কোম্পানি তার সমন্ধে জানে।
- ILOVEYOU
- Mydoom
- Melissa
- WannaCry
- Conficker
- Stuxnet
- Code Red
- Zeus
- Sasser
- CryptoLocker
এই ১০ টি পর্যন্তই সিমাবদ্ধ নয়। আরো হাজারো লক্ষ কোটি ভাইরাস রয়েছে। তাই নিজের কম্পিউটারকে সতর্কতার সাথে সকল প্রকারের ফাইল ডাউনলোড, আপলোড ও ব্যবহার করতে হবে। আর ভাইরাস চেক করার পদ্ধতি নিয়ে পরবর্ততে পোস্ট পাবেন, তাই নটিফেকেশন চালু করে রাখতে ভুলবেন না।
ভাইরাসগুলো আসলে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা থাকে, এই বিষয়ে আমাদের কম্পিউটার ভাইরাস কি পোস্টের মধ্যে ভালোভাবে আলোচনায় এসেছে। তবে সংক্ষেপে বলতে গেলে, এগুলোর কোনটা রয়েছে ডেটা চুরি করে, কোনটা রয়েছে ফাইল লক করে, কোনটা আবার ইন্টারনেট বা হার্ডওয়্যারের ক্ষতি করে। এর সাথে আরো ভাগ করা যায়, যেমন কোনটা আছে ইনস্টল হয়, কোনটা আছে পোর্টেবল, আবার কোনটা আছে লিংক এর মধ্যেই কাজ করতে পারে। আর এগুলোকেও ভিন্ন ভিন্ন নামের ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়ে থাকে।
ILOVEYOU
২০০০ সালে ফিলিপাইনের অনেল ডে গুজমান নামে এক প্রোগ্রামার “ILOVEYOU” নামের ভাইরাসটি তৈরি করেন। এটি ছিলো একধরনের ওয়ার্ম, যা ইমেইলের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ত। ব্যবহারকারীরা “I LOVE YOU” বিষয়ক একটি ইমেইল পেয়ে সংযুক্ত ফাইল খুললেই ভাইরাসটি সক্রিয় হতো এবং অটোমেটিকভাবে তাদের কন্টাক্ট লিস্টে থাকা সবাইকে সেই ভাইরাস পাঠিয়ে দিত। এটি হাজার হাজার কম্পিউটারকে আক্রান্ত করে ফাইল ধ্বংস করে দেয় এবং মেইল সার্ভারগুলোকে জ্যাম করে ফেলে।
Mydoom
২০০৪ সালে রাশিয়া থেকে উদ্ভূত হয় ‘Mydoom’ নামের সবচেয়ে দ্রুত ছড়ানো ভাইরাস। এর নির্মাতা এখনও অজানা। এটি ইমেইল এবং পিয়ার-টু-পিয়ার ফাইল শেয়ারিং মাধ্যম ব্যবহার করে নিজের প্রতিলিপি পাঠাতো। একসময় এটি ইন্টারনেটের গতি পর্যন্ত কমিয়ে ফেলেছিল। মূল লক্ষ্য ছিল DDoS (Distributed Denial of Service) আক্রমণ চালানো, যার ফলে বড় বড় কোম্পানির সার্ভার অচল হয়ে পড়ে।
Melissa
‘Melissa’ ভাইরাসটি তৈরি করেন মার্কিন নাগরিক ডেভিড এল. স্মিথ, ১৯৯৯ সালে। এটি ছিল Word ডকুমেন্ট ফাইলভিত্তিক, যেটি ইমেইলের মাধ্যমে পাঠানো হতো। ফাইলটি খোলা মাত্র ভাইরাসটি Microsoft Outlook ব্যবহার করে অটোমেটিকভাবে ৫০ জন কন্টাক্টে ছড়িয়ে পড়ত। এটি ডকুমেন্টের মধ্যে অবাঞ্ছিত বার্তা বসিয়ে দিত এবং ব্যবহারকারীর কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটাত।
WannaCry
২০১৭ সালে WannaCry নামক ভয়াবহ র্যানসমওয়্যার ভাইরাসটি বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ধারণা করা হয়, এটি উত্তর কোরিয়ার ‘Lazarus Group’ দ্বারা তৈরি। এটি Windows-এর SMB প্রটোকলের দুর্বলতা ব্যবহার করে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাসটি একটি বার্তার মাধ্যমে জানিয়ে দিত যে, আপনার ফাইল এনক্রিপ্ট করা হয়েছে এবং মুক্তিপণ না দিলে ফাইলগুলো কখনও ফিরে পাওয়া যাবে না। এটি হাসপাতাল, রেলওয়ে ও সরকারী প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের ক্ষতি করেছিল।
Conficker
২০০৮ সালে জার্মানিতে Conficker ভাইরাসটি তৈরি করা হয়। এর নির্মাতার পরিচয় অজানা। এটি মূলত Windows অপারেটিং সিস্টেমের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ছড়াতো এবং ইউএসবি ডিভাইসের মাধ্যমেও ইনস্টল হতো। ভাইরাসটি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কম্পিউটারকে রিমোটলি নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। এটি বিশ্বের লক্ষাধিক কম্পিউটারকে সংক্রমিত করেছিল এবং একটি বিশাল বটনেট তৈরি করেছিল।
Stuxnet
Stuxnet ভাইরাসটির নাম এলেই সাইবার যুদ্ধের কথা মাথায় আসে। ২০১০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ প্রচেষ্টায় এটি তৈরি করা হয়। এটি একটি অত্যন্ত জটিল ম্যালওয়্যার, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ মেশিন। ভাইরাসটি ইউএসবি ড্রাইভের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং নির্দিষ্ট হার্ডওয়্যার নিয়ন্ত্রণ করে সেটিকে নষ্ট করে দেয়। এটি ছিল বিশ্বের প্রথম সাইবার অস্ত্র হিসেবে পরিচিত।
Code Red
২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Marc Maiffret ও Ryan Permeh ‘Code Red’ ভাইরাসটি আবিষ্কার করেন। এটি Microsoft IIS ওয়েব সার্ভারের একটি দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ছড়িয়ে পড়ত। ভাইরাসটি আক্রান্ত ওয়েবসাইটের হোমপেজ পরিবর্তন করে সেখানে “Hacked by Chinese!” বার্তা বসিয়ে দিত। এটি White House-এর ওয়েব সার্ভারে আক্রমণের চেষ্টা করেছিল এবং RAM ব্যবহার করে সার্ভারকে ধীরগতি বা অচল করে দিত।
Zeus
২০০৭ সালে ইউক্রেন থেকে ‘Zeus’ নামের ভয়ঙ্কর ট্রোজান ভাইরাসটি ছড়াতে শুরু করে। একে Slavik নামের এক হ্যাকার তৈরি করেন। এটি মূলত ফিশিং, ব্রাউজারে ইনজেক্ট হওয়া স্ক্রিপ্ট এবং ভুয়া সফটওয়্যারের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। Zeus ভাইরাসটি ব্যবহারকারীর অনলাইন ব্যাংকিং তথ্য, পাসওয়ার্ড এবং অন্যান্য সংবেদনশীল ডেটা চুরি করে। এটি বিভিন্ন বড় ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে লক্ষবস্তু করেছিল।
Sasser
২০০৪ সালে জার্মানির ১৭ বছর বয়সী তরুণ Sven Jaschan ‘Sasser’ ভাইরাসটি তৈরি করেন। এটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিজেই ছড়িয়ে পড়তে পারত, ব্যবহারকারীর কোনো ইনপুট ছাড়াই। একবার ইনস্টল হলে এটি কম্পিউটারকে বারবার রিস্টার্ট করতে বাধ্য করত এবং নতুন সফটওয়্যার ইনস্টলেশনে বাধা সৃষ্টি করত। ফলে বহু কর্পোরেট সার্ভার অচল হয়ে পড়ে।
CryptoLocker
২০১৩ সালে পূর্ব ইউরোপের একটি হ্যাকার গ্রুপ ‘CryptoLocker’ নামক র্যানসমওয়্যার ভাইরাসটি চালু করে। এটি ইমেইলের মাধ্যমে ZIP ফাইল আকারে ছড়াত এবং একবার চালু হলে কম্পিউটারের গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো এনক্রিপ্ট করে ফেলত। ব্যবহারকারীকে জানানো হতো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মুক্তিপণ না দিলে ফাইলগুলো চিরতরে মুছে যাবে। এটি বহু মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

