আজও বহু মানুষের দিন শুরু হয় সংবাদপত্রে ছাপা রাশিফল দেখে। আবার অনেকে আছেন, যারা জ্যোতিষশাস্ত্রকে পুরোপুরি অবৈজ্ঞানিক বলে মনে করেন। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রাচীনকাল থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত শাসকগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবে গভীর আস্থা রাখতেন। ভারত শাসন করা মুঘল সম্রাটরাও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না।
প্রাচীন বিশ্বাস থেকে রাজদরবার
গ্রিস, পারস্য ও ভারত—সব সভ্যতাতেই আকাশের গতিবিধি বোঝার চেষ্টা চলেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই জ্ঞান ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। মধ্যযুগে এসে রাজনীতি, যুদ্ধ, এমনকি রাজ্যাভিষেকও নির্ধারিত হতো জ্যোতিষীদের গণনায়।
যদিও ইসলাম ও খ্রিষ্ট ধর্মে জ্যোতিষকে জাদুবিদ্যার কাছাকাছি হিসেবে দেখা হয় এবং ইসলাম মতে ভবিষ্যৎ জানার একমাত্র ক্ষমতা আল্লাহর—তবুও বাস্তব রাজনীতিতে বহু মুসলিম শাসক জ্যোতিষের দ্বারস্থ হয়েছেন।
গবেষকের চোখে মুঘল দরবার
প্রখ্যাত সাংবাদিক ও গবেষক এমজে আকবর তার বই After the Mughals: Astrology in the Mughal Empire-এ দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রায় সব মুঘল সম্রাটই জ্যোতিষে বিশ্বাস করতেন। তার মতে, হুমায়ুন থেকে শুরু করে আকবর, জাহাঙ্গীর এমনকি আওরঙ্গজেব—প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে জ্যোতিষীদের পরামর্শ নিতেন।
আকবরের জন্ম ও শুভ মুহূর্ত
তৃতীয় মুঘল সম্রাট আকবরের জন্মও জ্যোতিষ বিশ্বাসের এক নাটকীয় উদাহরণ। ইতিহাসবিদদের বর্ণনায় জানা যায়, প্রসবের সময় একটি বিরল নক্ষত্রযোগের অপেক্ষায় জন্মক্ষণ সাময়িকভাবে বিলম্বিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই ‘শুভ মুহূর্তেই’ জন্ম নেন আকবর—এমনটাই দাবি করা হয় আকবরনামায়।
জন্মের পর থেকেই তার বেড়ে ওঠা, শিক্ষা শুরু এবং ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণে নক্ষত্র গণনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
যুদ্ধ ও রাজ্যাভিষেকে জ্যোতিষ
শুধু জন্ম নয়—যুদ্ধ শুরু, রাজধানীতে ফেরা কিংবা শত্রুর বিরুদ্ধে অভিযান—সব ক্ষেত্রেই শুভ সময় বেছে নেওয়া হতো। আকবর তার দরবারে ‘জ্যোতিষরাজ’ নামে বিশেষ পদও সৃষ্টি করেছিলেন। এমনকি কোন দিন মাংস খাওয়া যাবে বা কোন রঙের পোশাক পরা হবে—সেটিও নির্ধারিত হতো গ্রহের অবস্থান দেখে।
জাহাঙ্গীর ও নক্ষত্রের ছায়া
আকবরের পুত্র জাহাঙ্গীরও জ্যোতিষে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন। তার আত্মজীবনী তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরি-তে তিনি নিজেই লিখেছেন, কীভাবে জ্যোতিষীদের পরামর্শে পরিবারের সদস্যদের দেখা-সাক্ষাৎ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হতো। এমনকি মুদ্রার এক পাশে রাশিচক্র খোদাই করিয়েছিলেন তিনিই।
আওরঙ্গজেব ও ভবিষ্যৎ পতনের ইঙ্গিত
সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক অধ্যায়টি আসে সম্রাট আওরঙ্গজেবকে ঘিরে। ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার-এর লেখা অনুযায়ী, আওরঙ্গজেব নিজের জন্মকুণ্ডলীর ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রাখতেন। জ্যোতিষীরা যে সময় নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই তিনি সিংহাসনে বসেন।
ফরাসি পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ের লিখেছেন, দীর্ঘ সামরিক অভিযানের সময়ও আওরঙ্গজেব নক্ষত্র গণনা মেনে চলতেন। এমনকি নিজের মৃত্যুর পর সাম্রাজ্যে অরাজকতা নেমে আসবে—এই ভবিষ্যদ্বাণীর কথাও তিনি ঘনিষ্ঠদের জানিয়েছিলেন।
যখন ভবিষ্যদ্বাণী ভুল হয়
তবে সব ভবিষ্যদ্বাণী যে মিলেছে, এমন নয়। বাবরের সময় এক জ্যোতিষী খানওয়ার যুদ্ধে পরাজয়ের আশঙ্কা করেছিলেন। বাবর সেই পরামর্শ উপেক্ষা করে যুদ্ধে জয়ী হন। এই ঘটনাই দেখায়—জ্যোতিষ সবসময় ইতিহাসের নিয়ন্তা ছিল না।
ইতিহাস কী বলে?
মুঘল দরবারে জ্যোতিষ ছিল বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও রাজনীতির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। কেউ একে বিজ্ঞানের অংশ মনে করতেন, কেউ আবার নিছক কুসংস্কার। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত—মুঘল সাম্রাজ্যের বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পেছনে নক্ষত্রের ছায়া ছিল।

