দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় এক নাটকীয় ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানী কারাকাসসহ একাধিক স্থানে বিস্ফোরণের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে একটি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আটক করা হয়েছে।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সহায়তায় পরিচালিত এই অভিযানে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে তারা বর্তমানে কোথায় আছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
কারাকাসে কী ঘটেছে?
শনিবার ভোরের দিকে কারাকাসে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা শহরের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখতে পান। কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবরও আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্ফোরণ ও হেলিকপ্টারের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লেও সেগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
ভেনেজুয়েলা সরকার জানিয়েছে, রাজধানীর পাশাপাশি মিরান্ডা, আরাগুয়া ও লা গুয়াইরা রাজ্যেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এখন পর্যন্ত হতাহতদের নির্ভরযোগ্য সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
কোথায় হামলা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে?
যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী, অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আলামত পাওয়া গেছে—
- লা কার্লোটা নামে পরিচিত জেনারেলিসিমো ফ্রান্সিসকো দে মিরান্ডা বিমানঘাঁটি
- লা গুয়াইরা বন্দর, যা কারাকাসের প্রধান সমুদ্রপথ
- কারাকাসের পূর্বদিকে অবস্থিত হিগুয়েরোতে বিমানবন্দর
ট্রাম্প কী বলেছেন?
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র “সফলভাবে” ভেনেজুয়েলা ও এর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে। তিনি এটিকে একটি “দুর্দান্ত অভিযান” বলে বর্ণনা করেন এবং জানান, বিস্তারিত তথ্য পরে প্রকাশ করা হবে।
তিনি ফ্লোরিডায় এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে আরও বক্তব্য দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ কী?
মার্কিন বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টে একাধিক গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—
- মাদক পাচার ও কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র
- ভারী অস্ত্র ও বিধ্বংসী অস্ত্রের মালিকানা
- যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সহিংস কার্যক্রমের পরিকল্পনা
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, মাদুরো সরাসরি আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। তবে এসব অভিযোগ তিনি বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন।
ভেনেজুয়েলা সরকারের প্রতিক্রিয়া
ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, সরকার জানে না মাদুরো ও তার স্ত্রী কোথায় আছেন। তিনি তাদের জীবিত থাকার “তাৎক্ষণিক প্রমাণ” চেয়েছেন।
দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ এই হামলাকে বিদেশি আগ্রাসন আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ভেনেজুয়েলা তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। সরকার দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছে এবং সশস্ত্র বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার পর বিশ্ব রাজনীতিতেও প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।
- রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে “সশস্ত্র আগ্রাসন” বলে নিন্দা জানিয়েছে।
- ইরান একে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
- কিউবা ও কলম্বিয়া লাতিন আমেরিকার স্বাধীনতার ওপর আঘাত বলে মন্তব্য করেছে।
- ইউরোপীয় ইউনিয়ন শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার ওপর জোর দিয়েছে।
সামনে কী হতে পারে?
মাদুরো সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে আছেন কি না, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। তবে এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র–ভেনেজুয়েলা সম্পর্ককে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকে তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব।

