আইএমএফের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড–এনবিআরের ওপর রাজস্ব আহরণের নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। চলতি অর্থবছরে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও এনবিআরের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা এক লাফে ৫৫ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে সাধারণ করদাতার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেও অতিরিক্ত চাপ পড়বে বলে আশঙ্কা উদ্যোক্তাদের।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। মধ্যম আয়ের ফাঁদ এড়ানো, ঋণনির্ভরতা কমানো এবং টেকসই অর্থনীতি গড়তে করব্যবস্থায় সংস্কার ও প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই।
প্রথমবারের মতো রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়াল সরকার
প্রতি বছর বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় অর্থবছরের মাঝামাঝি এসে সাধারণত রাজস্ব লক্ষ্য কমানো হয়। কিন্তু এ বছর ঘটল ব্যতিক্রম। প্রথমবারের মতো রাজস্ব লক্ষ্য বাড়ানো হয়েছে—তা-ও অভূতপূর্ব ৫৫ হাজার কোটি টাকায়।
আইএমএফ মিশনের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরের পর তাদের মন্তব্য ও পর্যালোচনা বিবেচনা করেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নেয়। নভেম্বরে অনুষ্ঠিত দুই বিশেষ বৈঠকে লক্ষ্য বাড়ানোর বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। এতে এনবিআরের মোট লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের ব্যবধান রয়ে গেছে। অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
কোন খাতে কত বাড়ল রাজস্ব লক্ষ্য?
সরকারি তথ্য অনুযায়ী—
- কাস্টমস/শুল্ক বিভাগে: +১৪,০০০ কোটি
- ভ্যাট খাতে: +২০,৩৫০ কোটি
- আয়কর খাতে: +২০,০০০ কোটি
এই তিন খাতেই বাড়তি চাপ পড়বে।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
বাঁধন ফ্যাশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন,
“লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো সহজ, কিন্তু বাড়তি রাজস্ব আদায় কোথা থেকে হবে তা স্পষ্ট নয়। ব্যবসায়ী খাতেই যদি অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হয়, তাহলে শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
ব্যবসায়ীদের মতে, করপদ্ধতি বিস্তৃত না করে একই শ্রেণির ওপর বাড়তি চাপ দেওয়া হলে অর্থনৈতিক পরিবেশ আরও কঠিন হবে।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,
“আমরা একটি জটিল ঋণনির্ভর পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। সময়মতো সংস্কার না করলে মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় ও রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন অপরিহার্য।”
তার মতে, এনবিআরের চলমান সংস্কার ও প্রযুক্তির সমন্বয়কে আরও জোরদার করতে হবে, নইলে বাড়তি লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
অতীতের অভিজ্ঞতা ভালো নয়
গত অর্থবছরে দু’বার লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েও শেষ পর্যন্ত তা পূরণ করতে পারেনি এনবিআর। এবার লক্ষ্য কমানোর বদলে উল্টো বাড়ানো হয়েছে—যা অর্জন করা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
