৭ দিনের সখ্যে হাদি হত্যা: পরিকল্পিত মিশন, ১২ ঘণ্টায় দেশ ছাড়ে ফয়সাল

0
99
হাদি হত্যা পরিকল্পনা
হাদি হত্যা পরিকল্পনা

৭ দিনের পরিকল্পিত সখ্যে হাদি হত্যা, ১২ ঘণ্টায় দেশ ছাড়ে ফয়সাল

বিদেশ থেকে দেশে ফিরে ধাপে ধাপে সাজানো হয়েছিল একটি ঠান্ডা মাথার হত্যাযজ্ঞ। মাত্র সাত দিনের মধ্যেই টার্গেটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলে বাস্তবায়ন করা হয় পরিকল্পিত গুলিবর্ষণ। আর হত্যাকাণ্ড ঘটার ১২ ঘণ্টার মধ্যেই দেশ ছাড়ে মূল অভিযুক্ত ফয়সাল। গোয়েন্দা তদন্তে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, হত্যার আগে ‘শ্যুটার টিম’ তৈরি, সখ্যতা গড়া, রেকি এবং আলামত গায়েব—সবই ছিল পূর্বপরিকল্পিত। সময় টেলিভিশনের হাতে আসা শতাধিক সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণে পুরো হত্যামিশনের নকশা স্পষ্ট হয়েছে।

কালচারাল সেন্টারেই পরিচয়, সেখান থেকেই শুরু

গত ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৮টা ১৮ মিনিটে বাংলামোটরের ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারে প্রথমবার হাদির সঙ্গে দেখা করেন ফয়সাল। সঙ্গে ছিলেন সহযোগী কবির। প্রায় ছয় মিনিটের বৈঠকে হাদির সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দিয়ে সখ্যতার ভিত্তি তৈরি করা হয়।

পাঁচ দিন পর, ৯ ডিসেম্বর, ফয়সাল আবার সেখানে হাজির হন। এবার তার সঙ্গী ছিলেন আলমগীর। আলোচনার বিষয় ছিল নির্বাচনী প্রচারণা। ওই বৈঠকের পরই হাদির টিমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন ফয়সাল।

১২ ডিসেম্বর সেগুনবাগিচায় সরাসরি প্রচারণায় অংশ নেওয়ার পরই হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

রেকি, প্রস্তুতি আর রিসোর্টে শেষ নির্দেশনা

মিশন বাস্তবায়নের আগে নরসিংদী, সাভার ও মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় রেকি করেন ফয়সাল। ১১ ডিসেম্বর তিনি ওঠেন পশ্চিম আগারগাঁওয়ে বোনের বাসায়। হামলার দিন ভোরে উবারে করে যান হেমায়েতপুরের একটি রিসোর্টে।

রিসোর্টের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ভোর ৫টা ২২ মিনিটে সেখানে পৌঁছান ফয়সাল ও আলমগীর। সেখানে আগে থেকেই ছিলেন ফয়সালের বান্ধবী মারিয়া ও তার বোন। তদন্ত অনুযায়ী, সেখানেই হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে বান্ধবীকে ঘটনার পর সব যোগাযোগ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন ফয়সাল।

প্রকাশ্যে প্রচারণা, পেছনে অনুসরণ

সকাল সাড়ে আটটার পর রিসোর্ট ছাড়েন ফয়সাল। বাড্ডায় বান্ধবীকে নামিয়ে দিয়ে আগারগাঁওয়ে ফিরে আসেন। সকাল ১১টার পর মোটরসাইকেলে করে সেগুনবাগিচার প্রচারণায় যোগ দেন তিনি।

দুপুর ১২টা ২২ মিনিটে হাদি মতিঝিলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলে শ্যুটাররা অটোরিকশা অনুসরণ শুরু করে। জুমার নামাজ শেষে প্রচারণা চলাকালেই সুযোগ খুঁজতে থাকে তারা।

খুব কাছ থেকে গুলি, তারপর পালানোর ছক

দুপুর ২টা ২৪ মিনিটে পল্টনের বক্স কালভার্ট এলাকায় খুব কাছ থেকে হাদিকে লক্ষ্য করে দুটি গুলি ছোড়া হয়। এরপরই শুরু হয় পরিকল্পিত পলায়ন।

বিজয়নগর, কাকরাইল, শাহবাগ হয়ে ফার্মগেইট পেরিয়ে পশ্চিম আগারগাঁওয়ের বাসায় ফেরে তারা। সেখানে গিয়ে অস্ত্র, মোবাইল ও মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট বদলসহ আলামত গায়েবের চেষ্টা চলে। পরিবারের সদস্যরাও এতে জড়িয়ে পড়ে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

১২ ঘণ্টায় সীমান্ত পার, আইপি লোকেশন ভারতে

হত্যার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একাধিক যানবাহন বদলে আমিনবাজার, ধামরাই, গাজীপুর হয়ে ময়মনসিংহে পৌঁছায় ফয়সাল। সেখান থেকে মানবপাচারকারীর সহায়তায় সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যায় সে।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ফয়সালের ফোনের আইপি লোকেশন ভারতের মহারাষ্ট্রে শনাক্ত হয়েছে এবং সে রিলায়েন্স সিম ব্যবহার করছিল।

তদন্তে নতুন প্রশ্ন

হত্যার পর অস্ত্র নদীতে ফেলে দেওয়া, পরিবারের সদস্যদের আত্মগোপন এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে বড় প্রশ্ন উঠেছে—এই হত্যাকাণ্ড কি একক লক্ষ্য ছিল, নাকি আরও ‘কিলিং মিশনের’ পরিকল্পনা ছিল?

ডিএমপির মুখপাত্র মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানিয়েছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে শনাক্তে তদন্ত চলমান রয়েছে এবং তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here