৫৪ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি: উন্নয়ন আর বৈষম্যের দ্বন্দ্ব

0
89
বাংলাদেশের অর্থনীতি ৫৪ বছর
বাংলাদেশের অর্থনীতি ৫৪ বছর

স্বাধীনতার পর পেরিয়ে গেছে ৫৪টি বছর। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে আজ উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত স্বীকৃতির একদম কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। এই দীর্ঘ যাত্রায় এসেছে অবকাঠামো, শিল্প ও রপ্তানিতে সাফল্য। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই অর্জন কি সবার জন্য সমানভাবে এসেছে? আদৌ কি বলা যায়, অর্থনীতির পূর্ণ বিজয় নিশ্চিত হয়েছে?

নগরজীবনের দিকে তাকালেই বৈপরীত্য স্পষ্ট। একদিকে আধুনিক অবকাঠামো—মেট্রোরেল এখন মতিঝিল থেকে উত্তরা যেতে সময় নেয় মাত্র ৩৫–৪০ মিনিট। অন্যদিকে, একই শহরে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য পেতে অনেককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় টিসিবির লাইনে। উন্নয়ন যেমন চোখে পড়ে, তেমনি টিকে থাকার লড়াইটাও নিত্যদিনের বাস্তবতা।

বিশ্ব ব্যাংকের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ যে কোনো সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। কর্মসংস্থান পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ২০ লাখ মানুষের কাজ কমেছে, আর ২০২৫ সালে আরও ৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে সম্পদের বণ্টনে বৈষম্য ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। ‘ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট ২০২৬’ অনুযায়ী, দেশের মোট সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশই কেন্দ্রীভূত হয়েছে শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী মানুষের হাতে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও তা সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে—সে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।

স্বাধীনতার পর যে কৃষি খাত অর্থনীতির ভরসা ছিল, সেখানেও সংকটের ছাপ। ঋণের বোঝা ও উৎপাদন খরচের চাপে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্ত ভিত পাচ্ছে না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকৃত বিজয় অর্জন করতে হলে কেবল প্রবৃদ্ধি নয়, নিশ্চিত করতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বাংলাদেশের অর্জনে গর্ব করার মতো অনেক কিছু থাকলেও সামনে এগোতে হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আয় বৈষম্য কমানোর দিকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

সরকার সামাজিক খাতে ব্যয় বাড়ালেও সেখানেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের মাত্র অর্ধেকই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় সহায়তা পাচ্ছে।

সব মিলিয়ে ৫৪ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই অগ্রযাত্রা এখনো সবার জন্য সমান হয়নি। আয় বৈষম্য ও বেকারত্ব কমাতে না পারলে অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত বিজয় ধরা দেবে না—এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here